শুক্রবার, ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬
বিমানবন্দরের অগ্নিকাণ্ড: দায় এড়াতে ব্যস্ত প্রতিষ্ঠান
প্রকাশের তারিখ : ৩০ অক্টোবর ২০২৫
বিমানবন্দরের অগ্নিকাণ্ড: দায় এড়াতে ব্যস্ত তিন প্রতিষ্ঠান
কেউ নিচ্ছে না দায়িত্ব, তদন্তেও অস্পষ্টতা
হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের কার্গো ভিলেজে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় দায়িত্ব এড়িয়ে চলছে সংশ্লিষ্ট তিন সংস্থা—বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ (বেবিচক), বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স এবং ঢাকা কাস্টমস হাউস। একে অপরের ওপর দায় চাপাচ্ছে প্রতিষ্ঠানগুলো। কিন্তু আগুন কেন এবং কীভাবে এত দ্রুত ছড়িয়ে পড়ল—তার সুনির্দিষ্ট জবাব এখনো কারও কাছে নেই। নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা বলছেন, দায়িত্বের সমন্বয় না থাকাই এমন বিপর্যয়ের মূল কারণ।
১৮ অক্টোবর বিকেলে কার্গো ভিলেজে লাগা আগুন মুহূর্তেই ছড়িয়ে পড়ে চারপাশে। ইতিহাসের অন্যতম ভয়াবহ এ দুর্ঘটনায় ভয়ংকর ধ্বংসযজ্ঞের চিত্র দেখা যায় বিমানবন্দর এলাকায়। অথচ কিছুদিন আগেই একটি আন্তর্জাতিক সংস্থার মূল্যায়নে শাহজালাল বিমানবন্দরকে নিরাপত্তার মানে ৯৩ শতাংশে ‘উত্তীর্ণ’ ঘোষণা করা হয়েছিল। বাস্তবে সেই নিরাপত্তা ব্যবস্থাই ২৭ ঘণ্টা ধরে আগুন নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থ হয়।
দায় এড়ানোর প্রতিযোগিতা
টিম সময়ের অনুসন্ধানে জানা যায়, ফায়ার সার্ভিসের ইউনিটগুলো আগুন লাগার পরও আট নম্বর গেটের বাইরে কিছু সময় অপেক্ষা করেছিল। প্রত্যক্ষদর্শীদের অভিযোগ, আগেই প্রবেশাধিকার পেলে ক্ষয়ক্ষতি অনেক কম হতো।
অন্যদিকে ঢাকা কাস্টমস হাউস দাবি করেছে, তাদের দায়িত্ব পণ্য নিরীক্ষা পর্যন্তই সীমাবদ্ধ—সংরক্ষণ বা নিরাপত্তা তাদের আওতায় পড়ে না। বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত দায় কার, তা বলা যাবে না। আর বেবিচক বলছে, তাদের অবকাঠামো ও প্রস্তুতি আন্তর্জাতিক মানেই ছিল।
আগুন ছড়ানোর পেছনে অব্যবস্থাপনা
কাস্টমসের জটিলতায় দীর্ঘদিন ধরে আটকে থাকা পণ্য, তার সঙ্গে বিমানের অযত্নে মজুত রাসায়নিক ও ওষুধ—সবকিছুই ছিল একসঙ্গে স্তূপাকারে। নিরাপত্তা বিধি অনুযায়ী ডেঞ্জার জোনে রাখার পরিবর্তে এসব দ্রব্য সাধারণ পণ্যের সঙ্গে মেশানো ছিল, ফলে অল্প সময়েই আগুন ভয়াবহ রূপ নেয়।
ঢাকা কাস্টমস হাউসের যুগ্ম কমিশনার মোহাম্মদ কামরুল হাসান জানান, “এখানে কাস্টমসের কোনো প্রক্রিয়াগত ব্যত্যয় হয়নি। পণ্যের প্রকৃতি নির্ধারণ আমাদের সরাসরি দায়িত্ব নয়।”
বেবিচক চেয়ারম্যান এয়ার ভাইস মার্শাল মো. মোস্তফা মাহমুদ সিদ্দিক বলেন, “বছরের পর বছর মালপত্র পড়ে ছিল, সরানো হয়নি। আন্তর্জাতিক মান অনুযায়ী সক্ষমতা ছিল, তবে ব্যবস্থাপনার ফাঁকফোকর ছিল।”
বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের জনসংযোগ মহাব্যবস্থাপক বোসরা ইসলাম বলেন, “তদন্ত প্রতিবেদনেই বোঝা যাবে দায় কার। যদি বিমানের দায়িত্ব প্রমাণিত হয়, আমরা সেটি স্বীকার করব।”
বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ
এভিয়েশন বিশেষজ্ঞ এটিএম নজরুল ইসলাম মনে করেন, “কাস্টমস ও বিমান—দুটি প্রতিষ্ঠানই সমানভাবে দায়ী। বিমানবন্দর জোনগুলোতে শুধু সাধারণ ফায়ার টিম নয়, বিশেষায়িত ইউনিট থাকা জরুরি। বিশেষ করে কার্গো ভিলেজ ও স্টোরেজ হ্যাংগারের মতো স্থানে আলাদা ফায়ার ফাইটিং টিম গঠনের উদ্যোগ নিতে হবে।”
আর্থিক বরাদ্দ ও পুরনো প্রশ্ন
বেবিচকের বার্ষিক বাজেটে নিরাপত্তা ও অবকাঠামো উন্নয়নের জন্য বিশাল অঙ্কের অর্থ বরাদ্দ থাকলেও, তার কত অংশ কার্গো এলাকার নিরাপত্তায় খরচ হয়েছে—তার কোনো স্পষ্ট হিসাব নেই।
এর আগে ২০১৩ সালের ৫ এপ্রিলও শাহজালাল বিমানবন্দরে আগুন লেগেছিল। সেই ঘটনাটি ঘটেছিল শুক্রবারে, আর এবারেরটি শনিবারে—দুইবারই ছুটির দিনে। কেন বারবার ছুটির দিনেই এমন দুর্ঘটনা ঘটছে, তা নিয়েও উঠছে নতুন প্রশ্ন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই অগ্নিকাণ্ড শুধু অব্যবস্থাপনার প্রতিচ্ছবি নয়, বরং দায়িত্বজ্ঞানহীনতার এক কঠিন সতর্কবার্তা। সময় এসেছে বিমানবন্দরের নিরাপত্তা কাঠামো নতুন করে ভাবার।
চেয়ারম্যান ও সম্পাদকঃ সামসুল আলমবার্তা সম্পাদকঃ মোঃ আসআদ
কপিরাইট © ২০২৫ ডি এস কে টিভি চ্যানেল
আপনার মতামত লিখুন