অর্ধশতাব্দী ধরে কুরআন শিক্ষায় নিবেদিত দাদা: ক্বারী হাতেম আলী সরকারের জীবন ও সেবা
হাজার হাজার শিক্ষার্থী গড়ে তুলেছেন, ৩০০’রও বেশি নিকাহ পড়িয়েছেন, পারিশ্রমিক ছাড়াই কুরআন শিক্ষাদান চালিয়ে যাচ্ছেন
বগুড়ার শিবগঞ্জ উপজেলার মোকামতলা এলাকার হরিপুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করা ক্বারী হাজি মোহাম্মদ হাতেম আলী সরকার, প্রায় অর্ধশতাব্দীরও বেশি সময় ধরে গ্রামবাংলার শিশু, কিশোর, যুবক ও বৃদ্ধাদের কুরআন শিক্ষা দিচ্ছেন। তিনি প্রাতিষ্ঠানিকভাবে ক্বারী পাস সম্পন্ন করেছেন এবং এখনও নিয়মিত পাঠদান চালিয়ে যাচ্ছেন।
শিক্ষকতার শুরু ও দীর্ঘ কর্মজীবন
১৯৭২ সালে ক্বারী হাতেম আলী শিশু ও কিশোরদের কুরআন পড়ানো শুরু করেন। শুরুতে অল্প কয়েকজন শিক্ষার্থী নিয়ে যাত্রা শুরু হলেও ধীরে ধীরে তাঁর পাঠশালা আশপাশের একাধিক গ্রামে ছড়িয়ে পড়ে।
মোকামতলা শাহ মোকাম মাদরাসায় তিনি ১৯৭২–২০০১ সাল পর্যন্ত শিক্ষকতার দায়িত্ব পালন করেন। পাশাপাশি তিনি বিভিন্ন গ্রামে ঘুরে ঘুরে আরবি ও কুরআন শিক্ষার ক্লাস পরিচালনা করেছেন। একসময় তাঁর তত্ত্বাবধানে প্রায় ২০–৩০টি গ্রামে নিয়মিত কুরআন শিক্ষার ব্যবস্থা ছিল।
শিশু, কিশোর, যুবক ও বৃদ্ধ—সকল বয়সী শিক্ষার্থীই তাঁর কাছে দল বেঁধে কুরআন পড়তে বসেন। স্থানীয়রা তাঁকে স্নেহভরে ‘দাদা’ বা ‘বড়োব্বা’ বলে ডাকে।
সহিহ তিলাওয়াত ও শিক্ষার অনন্য দক্ষতা
দীর্ঘ অভিজ্ঞতার কারণে কুরআন পাঠদান চলাকালে শিক্ষার্থীর ভুল হলে, তিনি অনেক সময় কিতাব না দেখেই সেটি শুদ্ধভাবে ঠিক করে বলে দেন। অথচ তিনি কোনো হাফেজ নন।
তাঁর মূল লক্ষ্য ছিল কেবল কুরআন পড়ানো নয়, বরং শিক্ষার্থীদের শুদ্ধভাবে আল্লাহর কালাম তিলাওয়াত শেখানো। বহু শিক্ষার্থী পরবর্তীতে বিভিন্ন মসজিদ ও মাদরাসায় ইমামতি এবং কুরআন শিক্ষার দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন।
শিক্ষার্থীর সংখ্যা ও কুরআন হস্তান্তর
দীর্ঘ শিক্ষকতা জীবনে তাঁর হাতে কতজন শিক্ষার্থী কুরআন শিখেছে—তার লিখিত হিসাব নেই। তবে স্থানীয়দের ধারণা, তাঁর হাতে গড়া শিক্ষার্থীর সংখ্যা ২০ হাজার ছাড়িয়ে গেছে।
সহিহ পাঠদান শেষে তাঁর হাত ধরেই প্রায় ৪০০ শিক্ষার্থী কুরআন হাতে তুলে নিয়েছেন।
পারিশ্রমিক ও মানবিকতা
কুরআন শিক্ষা দানের পারিশ্রমিক হিসেবে
তিনি মাসে মাত্র ১০–১০০ টাকা নেন। আর্থিক অসচ্ছল শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে কোনো পারিশ্রমিক নেওয়া হয় না।
নিকাহ পড়ানোর ক্ষেত্রে তিনি মানবিকতার দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। অনেক সময় মাত্র ৫০–৬০ টাকা নিয়েও বিয়ে পড়িয়ে দেন, আবার দরিদ্র ও অসহায়দের জন্য বিনা পারিশ্রমিকেও দায়িত্ব পালন করেন।
জীবনে পরিচালিত নিকাহের সংখ্যা ৩০০’র বেশি, যা গ্রামবাংলার মানুষদের জন্য বিরল এক ধর্মীয় সেবা হিসেবে বিবেচিত।
নীরব, নিরহংকারী ও আল্লাহভীরু জীবন
স্থানীয়দের মতে, ক্বারী হাতেম আলী প্রচারবিমুখ। তিনি কোনো পদ–পদবি বা সম্মাননার পেছনে দৌড়াননি। অত্যন্ত সাধারণ জীবনযাপন, কম কথা বলা এবং নিয়মিত ইবাদতের মধ্য দিয়েই কেটে গেছে তাঁর দীর্ঘ জীবন।
তাঁর পরিবারও অত্যন্ত সাদামাটা। পারিবারিক দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি তিনি কখনো কুরআন শিক্ষার কাজ থেকে নিজেকে বিচ্ছিন্ন করেননি।
নতুন প্রজন্মের জন্য অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত
বর্তমান সময়ে যখন অনেকেই আর্থিক লাভ ও ব্যক্তিগত প্রতিষ্ঠাকে জীবনের মূল লক্ষ্য হিসেবে গ্রহণ করছেন, তখন ক্বারী হাজি মোহাম্মদ হাতেম আলী সরকারের জীবন একটি ভিন্ন বার্তা দেয়—
নিঃস্বার্থভাবে মানুষের মাঝে কুরআনের আলো ছড়িয়ে দেওয়াই একজন মানুষের জীবনের সবচেয়ে বড় সাফল্য।

বৃহস্পতিবার, ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ২৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৬
অর্ধশতাব্দী ধরে কুরআন শিক্ষায় নিবেদিত দাদা: ক্বারী হাতেম আলী সরকারের জীবন ও সেবা
হাজার হাজার শিক্ষার্থী গড়ে তুলেছেন, ৩০০’রও বেশি নিকাহ পড়িয়েছেন, পারিশ্রমিক ছাড়াই কুরআন শিক্ষাদান চালিয়ে যাচ্ছেন
বগুড়ার শিবগঞ্জ উপজেলার মোকামতলা এলাকার হরিপুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করা ক্বারী হাজি মোহাম্মদ হাতেম আলী সরকার, প্রায় অর্ধশতাব্দীরও বেশি সময় ধরে গ্রামবাংলার শিশু, কিশোর, যুবক ও বৃদ্ধাদের কুরআন শিক্ষা দিচ্ছেন। তিনি প্রাতিষ্ঠানিকভাবে ক্বারী পাস সম্পন্ন করেছেন এবং এখনও নিয়মিত পাঠদান চালিয়ে যাচ্ছেন।
শিক্ষকতার শুরু ও দীর্ঘ কর্মজীবন
১৯৭২ সালে ক্বারী হাতেম আলী শিশু ও কিশোরদের কুরআন পড়ানো শুরু করেন। শুরুতে অল্প কয়েকজন শিক্ষার্থী নিয়ে যাত্রা শুরু হলেও ধীরে ধীরে তাঁর পাঠশালা আশপাশের একাধিক গ্রামে ছড়িয়ে পড়ে।
মোকামতলা শাহ মোকাম মাদরাসায় তিনি ১৯৭২–২০০১ সাল পর্যন্ত শিক্ষকতার দায়িত্ব পালন করেন। পাশাপাশি তিনি বিভিন্ন গ্রামে ঘুরে ঘুরে আরবি ও কুরআন শিক্ষার ক্লাস পরিচালনা করেছেন। একসময় তাঁর তত্ত্বাবধানে প্রায় ২০–৩০টি গ্রামে নিয়মিত কুরআন শিক্ষার ব্যবস্থা ছিল।
শিশু, কিশোর, যুবক ও বৃদ্ধ—সকল বয়সী শিক্ষার্থীই তাঁর কাছে দল বেঁধে কুরআন পড়তে বসেন। স্থানীয়রা তাঁকে স্নেহভরে ‘দাদা’ বা ‘বড়োব্বা’ বলে ডাকে।
সহিহ তিলাওয়াত ও শিক্ষার অনন্য দক্ষতা
দীর্ঘ অভিজ্ঞতার কারণে কুরআন পাঠদান চলাকালে শিক্ষার্থীর ভুল হলে, তিনি অনেক সময় কিতাব না দেখেই সেটি শুদ্ধভাবে ঠিক করে বলে দেন। অথচ তিনি কোনো হাফেজ নন।
তাঁর মূল লক্ষ্য ছিল কেবল কুরআন পড়ানো নয়, বরং শিক্ষার্থীদের শুদ্ধভাবে আল্লাহর কালাম তিলাওয়াত শেখানো। বহু শিক্ষার্থী পরবর্তীতে বিভিন্ন মসজিদ ও মাদরাসায় ইমামতি এবং কুরআন শিক্ষার দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন।
শিক্ষার্থীর সংখ্যা ও কুরআন হস্তান্তর
দীর্ঘ শিক্ষকতা জীবনে তাঁর হাতে কতজন শিক্ষার্থী কুরআন শিখেছে—তার লিখিত হিসাব নেই। তবে স্থানীয়দের ধারণা, তাঁর হাতে গড়া শিক্ষার্থীর সংখ্যা ২০ হাজার ছাড়িয়ে গেছে।
সহিহ পাঠদান শেষে তাঁর হাত ধরেই প্রায় ৪০০ শিক্ষার্থী কুরআন হাতে তুলে নিয়েছেন।
পারিশ্রমিক ও মানবিকতা
কুরআন শিক্ষা দানের পারিশ্রমিক হিসেবে
তিনি মাসে মাত্র ১০–১০০ টাকা নেন। আর্থিক অসচ্ছল শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে কোনো পারিশ্রমিক নেওয়া হয় না।
নিকাহ পড়ানোর ক্ষেত্রে তিনি মানবিকতার দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। অনেক সময় মাত্র ৫০–৬০ টাকা নিয়েও বিয়ে পড়িয়ে দেন, আবার দরিদ্র ও অসহায়দের জন্য বিনা পারিশ্রমিকেও দায়িত্ব পালন করেন।
জীবনে পরিচালিত নিকাহের সংখ্যা ৩০০’র বেশি, যা গ্রামবাংলার মানুষদের জন্য বিরল এক ধর্মীয় সেবা হিসেবে বিবেচিত।
নীরব, নিরহংকারী ও আল্লাহভীরু জীবন
স্থানীয়দের মতে, ক্বারী হাতেম আলী প্রচারবিমুখ। তিনি কোনো পদ–পদবি বা সম্মাননার পেছনে দৌড়াননি। অত্যন্ত সাধারণ জীবনযাপন, কম কথা বলা এবং নিয়মিত ইবাদতের মধ্য দিয়েই কেটে গেছে তাঁর দীর্ঘ জীবন।
তাঁর পরিবারও অত্যন্ত সাদামাটা। পারিবারিক দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি তিনি কখনো কুরআন শিক্ষার কাজ থেকে নিজেকে বিচ্ছিন্ন করেননি।
নতুন প্রজন্মের জন্য অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত
বর্তমান সময়ে যখন অনেকেই আর্থিক লাভ ও ব্যক্তিগত প্রতিষ্ঠাকে জীবনের মূল লক্ষ্য হিসেবে গ্রহণ করছেন, তখন ক্বারী হাজি মোহাম্মদ হাতেম আলী সরকারের জীবন একটি ভিন্ন বার্তা দেয়—
নিঃস্বার্থভাবে মানুষের মাঝে কুরআনের আলো ছড়িয়ে দেওয়াই একজন মানুষের জীবনের সবচেয়ে বড় সাফল্য।

আপনার মতামত লিখুন