বৃহস্পতিবার, ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬
ফৌজদারি কার্যবিধি সংশোধন করে নতুন অধ্যাদেশ জারি রাষ্ট্রপতির
প্রকাশের তারিখ : ১১ জুলাই ২০২৫
দেশের ১২৭ বছরের পুরনো ফৌজদারি বিচার ব্যবস্থায় একটা বিরাট পরিবর্তন আসতে চলেছে, আর সেটা হয়েছে রাষ্ট্রপতির একটি অধ্যাদেশে। যে আইনের ওপর দেশের লক্ষ লক্ষ মানুষের ভাগ্য ঝুলে থাকে, সেই আইনেই আনা হয়েছে এক ঐতিহাসিক সংশোধন। কিন্তু আসল প্রশ্নটা হলো, এই নতুন অধ্যাদেশ কি সাধারণ মানুষের জন্য সত্যিই কোনো সুফল বয়ে আনবে? এর ফলে কি মিথ্যা মামলার হয়রানি থেকে সত্যি সত্যি মুক্তি মিলবে? নাকি বিচার পাওয়ার দীর্ঘ অপেক্ষা আরও বাড়বে? ১: কেন এই পরিবর্তন জরুরি ছিল?) আচ্ছা, প্রথমেই বুঝতে হবে, সমস্যাটা ঠিক কোথায় ছিল। বাংলাদেশে ফৌজদারি বিচার চলে "ফৌজদারি কার্যবিধি, ১৮৯৮" (Code of Criminal Procedure, 1898) আইন দিয়ে। একবার ভাবুন, আইনটা তৈরি হয়েছিল ব্রিটিশ আমলে, একশো বছরেরও বেশি আগে। সময় বদলেছে, অপরাধের ধরন পাল্টেছে, কিন্তু আমাদের বিচার ব্যবস্থার অনেক নিয়মই সেই পুরনো রয়ে গেছে। আর এর সবচেয়ে বড় ভুক্তভোগী কে হচ্ছিল? আপনি-আমি, সাধারণ মানুষ। দেশের আদালতগুলোতে মামলার যে পাহাড় জমেছে, তাকে আমরা "মামলার জট" নামে চিনি। একটা মামলা শুরু হলে শুধু তার তদন্ত শেষ হতেই মাস এমনকি বছর পেরিয়ে যেত। এই লম্বা সময়ে অভিযুক্ত ব্যক্তিকে যে কী পরিমাণ হয়রানির শিকার হতে হতো, তা বলার মতো না। কেউ যদি নির্দোষও হতেন, শুধু সন্দেহের কারণে তাকে লম্বা সময় জেলে থাকতে হতো, নিয়মিত আদালতে হাজিরা দিতে হতো, আর উকিলের পেছনে টাকা খরচ তো আছেই। ধরুন, আপনার বিরুদ্ধে কেউ একটা झूठा বা হয়রানিমূলক মামলা করে দিল। পুরনো আইনে, পুলিশ তদন্ত করে ফাইনাল রিপোর্ট না দেওয়া পর্যন্ত আদালতের তেমন কিছুই করার থাকতো না। তদন্তকারী কর্মকর্তার রিপোর্টের জন্য অপেক্ষা করা ছাড়া আপনার কোনো উপায়ই ছিল না। এই প্রক্রিয়ায় একজন নিরপরাধ মানুষের জীবন থেকে কত যে মূল্যবান সময়, টাকা আর সম্মান চলে যেত, তার কোনো হিসাব নেই। ঠিক এই ভোগান্তি আর দীর্ঘসূত্রিতা কমাতেই দরকার ছিল একটা বড় ধাক্কার, যার ফল হলো এই নতুন অধ্যাদেশ। (বিভাগ ২: ঐতিহাসিক পরিবর্তন - নতুন অধ্যাদেশে কী আছে?) এই সমস্যার সমাধান হিসেবেই রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন "The Code of Criminal Procedure (Amendment) Ordinance, 2025" নামে একটি অধ্যাদেশ জারি করেছেন। এই এক অধ্যাদেশের মাধ্যমে ফৌজদারি কার্যবিধিতে একটি নতুন ধারা যোগ করা হয়েছে, আর সেটি হলো ধারা ১৭৩এ (Section 173A)। এই একটা ধারাই পুরো বিচার প্রক্রিয়ায় একটা যুগান্তকারী পরিবর্তন আনার ক্ষমতা রাখে। চলুন, একদম সহজ করে বুঝি, এই নতুন ধারায় কী বলা হয়েছে। এই ধারার নাম "অন্তর্বর্তীকালীন তদন্ত প্রতিবেদন ইত্যাদি" বা "Interim investigation report, etc."। এর অধীনে দুটো প্রধান বিষয় আছে: ১. অন্তর্বর্তীকালীন প্রতিবেদন (Interim Report): এখন থেকে পুলিশ বা অন্য তদন্তকারী সংস্থার বড় কর্মকর্তারা (যেমন পুলিশ কমিশনার বা এসপি) চাইলে তদন্তকারী অফিসারকে চলমান মামলার অগ্রগতি নিয়ে একটা অন্তর্বর্তীকালীন বা প্রাথমিক রিপোর্ট জমা দিতে বলতে পারবেন। এর মানে হলো, ফাইনাল রিপোর্টের জন্য আর অনির্দিষ্টকাল বসে থাকতে হবে না। তদন্তের একটা পর্যায়েই রিপোর্ট তৈরি করা যাবে। ২. অন্তর্বর্তীকালীন অব্যাহতি (Interim Discharge): যদি সেই প্রাথমিক রিপোর্টে দেখা যায় যে, কোনো অভিযুক্তের বিরুদ্ধে মামলা চালানোর মতো যথেষ্ট তথ্য-প্রমাণ বা সাক্ষী নেই, তবে সেই রিপোর্ট আদালতে জমা দেওয়া হবে। আদালত যদি ওই রিপোর্টের সঙ্গে একমত হন এবং বোঝেন যে, ওই ব্যক্তির বিরুদ্ধে মামলা এগিয়ে নেওয়ার কোনো ভিত্তি নেই, তাহলে আদালত তাকে মামলা থেকে অব্যাহতি বা Discharge দিতে পারবেন। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার হলো, এজন্য মামলার তদন্ত পুরোপুরি শেষ হওয়ার দরকার নেই। তার মানে, এখন থেকে একজন ব্যক্তি, যিনি হয়তো নির্দোষ, তাকে আর তদন্ত শেষ হওয়ার লম্বা পথ পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে না। তদন্তের প্রাথমিক বা মাঝামাঝি পর্যায়েই তিনি হয়রানি থেকে মুক্তি পেতে পারেন। তবে হ্যাঁ, একটা বিষয় মাথায় রাখতে হবে। এই অব্যাহতি কিন্তু চূড়ান্ত নয়। যদি পরে তদন্তে ওই ব্যক্তির বিরুদ্ধে কোনো নতুন শক্তিশালী প্রমাণ পাওয়া যায়, তাহলে ফাইনাল চার্জশিটে তার নাম আবার অন্তর্ভুক্ত করার সুযোগ রাখা হয়েছে। এটা করা হয়েছে যাতে কোনো আসল অপরাধী আইনের এই সুযোগের অপব্যবহার করে ছাড়া না পেয়ে যায়। (বিভাগ ৩: আপনার জীবনে এর প্রভাব কী?) এখন সবচেয়ে জরুরি প্রশ্ন, এই আইনের পরিবর্তনে আপনার আমার মতো সাধারণ মানুষের কী লাভ হবে? এর যেমন ভালো দিক আছে, তেমনি কিছু চ্যালেঞ্জও কিন্তু আছে। কী কী ভালো হতে পারে: হয়রানি থেকে মুক্তি: এর সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো, মিথ্যা বা হয়রানিমূলক মামলায় ফেঁসে যাওয়া মানুষের ভোগান্তি অনেক কমে আসবে। কেউ যদি আপনাকে হেনস্তা করার জন্য মামলা করে, আর পুলিশের প্রাথমিক তদন্তে তার ভিত্তি খুঁজে না পাওয়া যায়, তাহলে আপনাকে আর বছর বছর কোর্টের বারান্দায় ঘুরতে হবে না। অন্তর্বর্তীকালীন প্রতিবেদনের ভিত্তিতেই আপনি দ্রুত ছাড়া পেতে পারেন। দ্রুত বিচার: যখন নির্দোষ ব্যক্তিরা তদন্ত পর্যায় থেকেই অব্যাহতি পাবেন, তখন আদালতের ওপর থেকে মামলার বোঝা কমবে। এতে আদালত শুধু আসল অপরাধীদের বিচারে মনোযোগ দিতে পারবে আর বিচার প্রক্রিয়াও দ্রুত হবে। জেলখানায় চাপ কম: আমাদের দেশের জেলখানাগুলোতে ধারণক্ষমতার চেয়ে অনেক বেশি বন্দী, যাদের একটা বড় অংশই বিচারাধীন। নতুন আইনের ফলে যদি তদন্ত চলাকালেই অনেকে মুক্তি পান, তাহলে কারাগারের ওপর চাপ কমবে, সরকারের খরচও বাঁচবে। টাকা ও সময়ের সাশ্রয়: একটা মামলা চালানো মানেই টাকার খেলা। উকিলের ফি, কোর্টে আসা-যাওয়া, আর কাজের দিনের ক্ষতি—এই সবকিছু থেকে একজন নিরপরাধ মানুষ অনেক আগেই মুক্তি পাবেন। সমালোচনা এবং চ্যালেঞ্জ: অপব্যবহারের ঝুঁকি: এই আইনের সাফল্য পুরোপুরি নির্ভর করছে পুলিশের নিরপেক্ষতা আর সততার ওপর। যদি পুলিশ কোনো চাপে পড়ে বা ইচ্ছে করে তাড়াহুড়ো করে কোনো অন্তর্বর্তীকালীন রিপোর্ট জমা দেয়, তাহলে এর অপব্যবহার হতে পারে। একজন প্রকৃত অপরাধী হয়তো প্রাথমিক পর্যায়েই অব্যাহতি পেয়ে যেতে পারে। আদালতের দায়িত্ব বৃদ্ধি: এখন থেকে আদালতকে আরও বেশি সতর্ক থাকতে হবে। শুধু ফাইনাল রিপোর্টের জন্য বসে না থেকে, প্রতিটি অন্তর্বর্তীকালীন রিপোর্ট খুব ভালোভাবে যাচাই করতে হবে। পুলিশি প্রতিবেদনটি সত্যি তথ্যের ওপর ভিত্তি করে তৈরি কি না, তা নিশ্চিত করতে হবে। এতে বিচারকদের ওপর কাজের চাপ বাড়তে পারে। সমন্বয়ের অভাব: পুলিশ, আইনজীবী এবং বিচারক—এই তিন পক্ষের মধ্যে নতুন আইনটি প্রয়োগের জন্য সঠিক বোঝাপড়া আর প্রশিক্ষণের দরকার। এর কোনো এক জায়গায় ঘাটতি থাকলে, আইনটির সুফল পুরোপুরি পাওয়া যাবে না। সুতরাং, আইনটি নিঃসন্দেহে একটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ, কিন্তু এর সাফল্য নির্ভর করছে এর সঠিক এবং নিরপেক্ষ প্রয়োগের ওপর। (কল-টু-অ্যাকশন) এই নতুন আইন নিয়ে আপনার কী মনে হচ্ছে? আপনি কি ভাবছেন এর ফলে সাধারণ মানুষের হয়রানি সত্যিই কমবে? নাকি অপব্যবহারের আশঙ্কাই বেশি? আপনার মতামতটা নিচের কমেন্ট বক্সে আমাদের জানান। আর আইন ও অধিকার নিয়ে এমন গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা নিয়মিত পেতে আমাদের চ্যানেলটি সাবস্ক্রাইব করুন। ভিডিওটি আপনার বন্ধু ও পরিবারের সঙ্গে শেয়ার করতে ভুলবেন না, যাতে সবাই এই পরিবর্তনটা সম্পর্কে জানতে পারে। (বিভাগ ৪: আইন বিশেষজ্ঞরা কী বলছেন?) এই ঐতিহাসিক পরিবর্তন নিয়ে দেশের বড় বড় আইন বিশেষজ্ঞরা মিশ্র প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন। বেশিরভাগ বিশেষজ্ঞই এই পদক্ষেপকে স্বাগত জানিয়েছেন এবং একে বিচার ব্যবস্থার সংস্কারের পথে একটি বড় ধাপ হিসেবে দেখছেন। তাদের মতে, এই আইন বিচারপ্রার্থী মানুষের অধিকার রক্ষায়
চেয়ারম্যান ও সম্পাদকঃ সামসুল আলমবার্তা সম্পাদকঃ মোঃ আসআদ
কপিরাইট © ২০২৫ ডি এস কে টিভি চ্যানেল
আপনার মতামত লিখুন