বৃহস্পতিবার, ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬
আইনশৃঙ্খলার প্রতি মানুষের আস্থা নেই আলোচিত সোহাগ হত্যাকাণ্ড নিয়ে যা বললেন আইনজীবী শাহীন**
প্রকাশের তারিখ : ১৭ জুলাই ২০২৫
আইনশৃঙ্খলার প্রতি মানুষের আস্থা নেই আলোচিত সোহাগ হত্যাকাণ্ড নিয়ে যা বললেন আইনজীবী শাহীন**
প্রকাশ্য দিবালোকে একটা খুন, আর তার চারপাশে শত শত নীরব দর্শক। ভাবুন তো একবার। এটা শুধু একজন মানুষের মৃত্যু না, এটা আমাদের সমাজের আইন আর বিশ্বাসের মৃত্যু। গত ৯ই জুলাই, ২০২৫, ঢাকার রাস্তায় শত শত মানুষের সামনে, ইট-পাথর দিয়ে পিটিয়ে মেরে ফেলা হলো ব্যবসায়ী লাল চাঁদ ওরফে সোহাগকে। এই ঘটনার ভিডিও যখন সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে পড়ল, তখন আমাদের প্রত্যেকের বিবেককে যেন একটা ধাক্কা দিয়ে গেল।
পুলিশ বলছে, ব্যবসায়িক শত্রুতার জেরে এই খুন। কিন্তু একটা ব্যবসায়িক দ্বন্দ্ব কি এতটাই ভয়ংকর হতে পারে? নাকি এর আড়ালে লুকিয়ে আছে আরও গভীর কোনো যন্ত্রণা? এমন কোনো ক্ষোভ, যা বিচার ব্যবস্থার ওপর বিশ্বাস হারিয়ে ফেললে মানুষকে ব্যক্তিগত প্রতিশোধ নিতে বাধ্য করে? কেন আজ আইনশৃঙ্খলার ওপর মানুষের ভরসা প্রায় শূন্যের কোঠায়? আমি, আইনজীবী শাহীন, আজ সোহাগ হত্যাকাণ্ডের সূত্র ধরে সেই কঠিন সত্যগুলো নিয়ে কথা বলব, যা আমাদের দেখিয়ে দিচ্ছে, আমাদের সমাজ আর বিচার ব্যবস্থা কতটা গভীর সংকটের মধ্যে আছে।
### **প্রথম পর্ব: কী ঘটেছিল সেদিন?**
ঘটনাটা ঘটেছে ঢাকার অন্যতম ব্যস্ত এলাকা, মিটফোর্ড হাসপাতালের সামনে। ভাঙারি ব্যবসায়ী সোহাগকে একদল লোক ঘিরে ধরে। তাকে বিবস্ত্র করে রাস্তায় ফেলে ইট, পাথর আর সিমেন্টের ভারী বোল্ডার দিয়ে ততক্ষণ মারা হয়, যতক্ষণ না তার শরীরটা নিথর হয়ে যায়। শোনা যাচ্ছে, হামলাকারীরা নাকি স্লোগান দিচ্ছিল, এমন একটা ভাব তৈরির চেষ্টা করছিল, যেন এটা কোনো অন্যায়ের বিরুদ্ধে সাধারণ মানুষের প্রতিবাদ।
ঘটনার ভয়াবহতা এতটাই ছিল যে, এটা দ্রুত সারা দেশে আলোচনার ঝড় তোলে। এই হত্যাকাণ্ডের পর পুলিশ ও র্যাব দ্রুত অভিযান চালিয়ে ৯ জনকে গ্রেপ্তার করেছে, যার মধ্যে হত্যাকাণ্ডের মূল পাথর নিক্ষেপকারী হিসেবে অভিযুক্ত রেজওয়ান উদ্দিন অভিও আছে। ডিএমপি কমিশনার জানিয়েছেন, এর সাথে কোনো রাজনৈতিক যোগসাজশ নেই, পুরোটাই ব্যবসায়িক কোন্দল। তাদের মতে, পল্লী বিদ্যুতের চোরাই তারের ব্যবসা নিয়েই এই শত্রুতার শুরু, যার সাথে নিহত সোহাগ এবং অভিযুক্তরা, দুই পক্ষই জড়িত ছিল।
### **দ্বিতীয় পর্ব: বিশ্বাসের সংকট কেন?**
পুলিশের ভাষ্যমতে, এটি ব্যবসায়িক দ্বন্দ্ব। কিন্তু যখন পাথর নিক্ষেপকারী হিসেবে অভিযুক্ত রেজওয়ান উদ্দিন অভির পেছনের গল্পটি শোনা যায়, তখন এই নৃশংসতার এক ভিন্ন এবং আরও ভয়ংকর দিক সামনে আসে। যদিও এই তথ্যগুলো এখনো পুরোপুরি যাচাই করা হয়নি, তবে তদন্তকারী কর্মকর্তাদের সূত্র ধরে এবং বিভিন্ন মাধ্যমে যে অভিযোগগুলো উঠে আসছে, তা হলো—অভির মনে সোহাগের প্রতি ছিল তীব্র এক ব্যক্তিগত ঘৃণা আর ক্ষোভ।
অভিযোগ উঠেছে যে, নিহত সোহাগ একসময় অভির দোকান দখল করে নিয়েছিল। শুধু তাই নয়, বলা হচ্ছে যে, অভির স্ত্রীর ব্যক্তিগত ছবি দেখিয়ে তাকে ব্ল্যাকমেইল করা হতো এবং তার কাছ থেকে টাকাও নেওয়া হয়েছিল। এই মানসিক চাপের শেষটা হয়েছিল এক মর্মান্তিক ট্র্যাজেডিতে—অভির স্ত্রী আত্মহত্যা করেন। এই ঘটনার পর অভি মানসিকভাবে পুরোপুরি ভেঙে পড়েন। সোহাগের ওপর তার মনে যে ক্ষোভ জমেছিল, তা ছিল আগ্নেয়গিরির মতো। ৯ই জুলাই, সোহাগকে যখন মারধর করা হচ্ছিল, তখন অভি সেই সুযোগে তার জমে থাকা সমস্ত ঘৃণা আর প্রতিশোধস্পৃহার বহিঃপ্রকাশ ঘটায়, একের পর এক পাথর ছুঁড়ে।
এখন প্রশ্ন হলো, আমরা কি অভির এই বর্বরতাকে সমর্থন করব? অবশ্যই না। আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার অধিকার কারো নেই এবং এই নৃশংসতার সর্বোচ্চ শাস্তিই হওয়া উচিত। কিন্তু একজন আইনজীবী এবং সমাজের নাগরিক হিসেবে আমাদের এই প্রশ্নটাও করতে হবে—অভি কেন আইনের কাছে না গিয়ে এমন ভয়ংকর পথ বেছে নিলেন?
উত্তরটা লুকিয়ে আছে আমাদের বিচার ব্যবস্থা আর আইন প্রয়োগকারী সংস্থার প্রতি সাধারণ মানুষের আস্থাহীনতার মধ্যে। যখন একজন মানুষ প্রভাবশালী কারো দ্বারা অত্যাচারিত হয়েও থানায় ঘুরে বিচার পায় না, যখন সে দেখে আইনের রক্ষকরাই দুর্নীতিগ্রস্ত, তখন তার মনে এই বিশ্বাস জন্মে যে এই রাষ্ট্র তাকে নিরাপত্তা দিতে পারবে না। এই বিশ্বাসহীনতা থেকেই হতাশা জন্মায়, আর সেই হতাশা থেকেই জন্মায় ব্যক্তিগত প্রতিশোধের ইচ্ছা। অভির ঘটনাটি কোনো বিচ্ছিন্ন উদাহরণ নয়; এটা সেই অসংখ্য মানুষের প্রতিচ্ছবি, যারা নীরবে অন্যায় সয়ে যায়, কারণ তারা জানে বিচার চাইতে গেলে উল্টো আরও হয়রানির শিকার হতে হবে।
এই আস্থাহীনতা একদিনে তৈরি হয়নি। এর পেছনে আছে বছরের পর বছর ধরে চলা বিচার প্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রিতা, রাজনৈতিক প্রভাবে তদন্ত আটকে যাওয়ার অসংখ্য নজির আর দুর্নীতির গভীর জাল। সোহাগ হত্যাকাণ্ডের পরও যখন নিরপেক্ষ তদন্তের জন্য হাইকোর্টে বিচারিক কমিশন চেয়ে রিট করতে হয়, তখনই বোঝা যায় যে প্রচলিত ব্যবস্থার ওপর আস্থা কতটা কম।
### **তৃতীয় পর্ব: কেন সবাই চুপ করে দেখল?**
সোহাগ হত্যাকাণ্ডের সবচেয়ে ভয়ের দিকটা হলো, ঘটনাস্থলে থাকা শত শত মানুষের নীরবতা। কেন কেউ এগিয়ে এলো না? কেন কেউ প্রতিবাদ করলো না? সহজ উত্তর হলো ভয়। কিন্তু কিসের ভয়? শুধু হামলাকারীদের ভয় নয়, এই ভয় আরও গভীর। এটা সেই সিস্টেমের প্রতি ভয়, যা একজন প্রতিবাদকারীকে সুরক্ষা দেওয়ার নিশ্চয়তা দেয় না।
সাধারণ মানুষ যখন দেখে যে, অন্যায়ের প্রতিবাদ করতে গিয়ে যদি সে নিজেই কোনো মামলা- মোকদ্দমায় ফেঁসে যায়, তাহলে পুলিশ বা আইন তাকে বাঁচানোর বদলে উল্টো হয়রানি করতে পারে, তখন সে চুপ থাকাই নিরাপদ মনে করে। এই সামাজিক নিষ্ক্রিয়তা শুধু আমাদের নৈতিক অবক্ষয় নয়, এটা আমাদের রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর ব্যর্থতারও প্রমাণ। একটা সুস্থ সমাজে মানুষ একে অপরের রক্ষাকবচ হয়, কারণ তারা জানে রাষ্ট্র তাদের পাশে আছে। কিন্তু যখন সেই ভরসার জায়গাটাই নড়বড়ে হয়ে যায়, তখন সমাজেও সবাই একা হয়ে পড়ে। প্রত্যেকে নিজের খোলের মধ্যে ঢুকে যায়। সোহাগের চারপাশে দাঁড়িয়ে থাকা সেই নীরব জনতা আসলে আমাদের সম্মিলিত আস্থাহীনতারই এক জীবন্ত প্রতিচ্ছবি।
### **চতুর্থ পর্ব: সমাধান কোন পথে?**
সোহাগ হত্যাকাণ্ডের পর আমরা সেই পরিচিত দৃশ্যই আবার দেখছি। সরকার আর আইনশৃঙ্খলা বাহিনী অপরাধ দমনে কঠোর অবস্থানের কথা বলছে। অন্যদিকে, বিরোধী দলগুলো দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতির জন্য সরকারকে দায়ী করছে এবং পাল্টা অভিযোগ করছে যে, এসব ঘটনাকে ব্যবহার করে তাদের হয়রানি করা হচ্ছে। এই রাজনৈতিক দোষারোপের খেলায় মূল সমস্যাটা, অর্থাৎ বিচার ব্যবস্থার প্রতি মানুষের আস্থা ফিরিয়ে আনার প্রশ্নটা, প্রায়ই হারিয়ে যায়।
এই সংকট থেকে বের হওয়ার পথ শুধু কয়েকটি গ্রেপ্তার বা একটি মামলার বিচারে আটকে থাকতে পারে না। এর জন্য কিছু মৌলিক পরিবর্তন দরকার।
প্রথমত, পুলিশকে রাজনৈতিক প্রভাব থেকে মুক্ত করতে হবে। তাদের নিয়োগ, পদোন্নতি আর কাজের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে হবে, যাতে তারা কোনো দল বা ব্যক্তির জন্য নয়, শুধু দেশের আইন আর সংবিধানের প্রতি দায়বদ্ধ থাকে।
দ্বিতীয়ত, বিচার ব্যবস্থার সংস্কার করতে হবে। মামলার জট কমিয়ে যত দ্রুত সম্ভব ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে হবে। বিচার প্রক্রিয়াকে এমনভাবে সহজ করতে হবে, যাতে একজন সাধারণ, ক্ষমতাহীন মানুষও ভয় বা হয়রানি ছাড়াই আদালতে যেতে পারে।
এবং তৃতীয়ত, পুলিশ ও জনগণের মধ্যে আস্থার সম্পর্ক গড়ে তুলতে হবে। কমিউনিটি পুলিশিং বা এই ধরনের উদ্যোগের মাধ্যমে বোঝাতে হবে যে, পুলিশ তাদের বন্ধু ও রক্ষক, প্রতিপক্ষ নয়।
### **আপনার মতামত কী?**
এই যে বিচার ব্যবস্থার প্রতি অনাস্থা, সামাজিক অবক্ষয় আর তার ফলে ঘটে যাওয়া নৃশংস হত্যাকাণ্ড—এই চক্র থেকে আমরা বের হব কীভাবে? এই ধরনের ঘটনা ঠেকাতে আমাদের সমাজ ও বিচার ব্যবস্থার আর কী কী করা উচিত বলে আপনি মনে করেন? আপনার মতামত কমেন্ট সেকশনে জানান। এই আলোচনাটি যদি আপনার কাছে জরুরি মনে হয়, তবে শেয়ার করে ছড়িয়ে দিন, যাতে ন্যায়বিচারের এই আওয়াজ আরও জোরালো হয়।
### **উপসংহার**
সোহাগ হত্যাকাণ্ড কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। এটা একটা লক্ষণ মাত্র। আসল রোগটা আরও গভীরে—আমাদের প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর মানুষের বিশ্বাস ভেঙে পড়েছে। রেজওয়ান উদ্দিন অভির মতো একজন মানুষ যখন ব্যক্তিগত ট্র্যাজেডির পর আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার মতো ভয়ংকর পথ বেছে নেয়, তখন তা শুধু তার একার ব্যর্থতা নয়, এটা আমাদের রাষ্ট্র আর সমাজের সম্মিলিত ব্যর্থতা।
এই অবস্থা থেকে বের হতে শুধু কঠোর আইনই যথেষ্ট নয়, প্রয়োজন বিচার ব্যবস্থার ওপর সাধারণ মানুষের আস্থা ফিরিয়ে আনা। আর সেই আস্থা ফিরবে সময়মতো ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির মাধ্যমে। সেই আস্থা ফিরবে যখন মানুষ দেখবে আইন সবার জন্য সমান—গরিবের জন্য এক নিয়ম, আর প্রভাবশালীর জন্য আরেক নিয়ম নয়। যতক্ষণ আমরা সেই বিশ্বাস প্রতিষ্ঠা করতে না পারছি, ততক্ষণ সোহাগের মতো আরও অনেক হত্যাকাণ্ড আমাদের দেখতে হবে, আর আমরাও হয়তো সেই নীরব দর্শকদের দলেই থেকে যাব। সময় এসেছে এই নীরবতা ভাঙার এবং একটি নিরাপদ সমাজের জন্য একসাথে আওয়াজ তোলার।
চেয়ারম্যান ও সম্পাদকঃ সামসুল আলমবার্তা সম্পাদকঃ মোঃ আসআদ
কপিরাইট © ২০২৫ ডি এস কে টিভি চ্যানেল
আপনার মতামত লিখুন